যদিও সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তবে এ স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ পরিবহন সংস্থা (আইএটিএ) সতর্ক করে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি সচল হলেও জ্বালানি সরবরাহ ও এর বাজারমূল্য স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে আরো কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে। খবর রয়টার্স।
সিঙ্গাপুরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আইএটিএর মহাপরিচালক উইলি ওয়ালশ জানান, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা চাইলেই দ্রুত পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়।
তিনি বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের তেল শোধনাগার বা রিফাইনারিগুলোর সক্ষমতা যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাতে আগের অবস্থায় ফিরতে বেশ কয়েক মাস সময় লাগবে।’
ওয়ালশের মতে, এ সমস্যা মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব নয়। উল্লেখ্য, যুদ্ধের কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ কয়েক সপ্তাহ ধরে কার্যত অচল ছিল। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের পাঁচ ভাগের এক ভাগ এ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অপরিশোধিত তেলের প্রবাহ শুরু হলেও শোধনাগারগুলোর কারিগরি সমস্যার কারণে জ্বালানি সংকটের রেশ দীর্ঘস্থায়ী হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের ডামাডোলে আন্তর্জাতিক বাজারে জেট ফুয়েলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। যুদ্ধের আগে ইউরোপে জেট ফুয়েলের বেঞ্চমার্ক মূল্য ছিল টনপ্রতি ৮৩১ ডলার। কিন্তু গত সপ্তাহ নাগাদ তা রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে ১ হাজার ৮৩৮ ডলারে (প্রায় ১ হাজার ৩৮৭ পাউন্ড) গিয়ে ঠেকেছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, একটি এয়ারলাইনস কোম্পানির মোট পরিচালন ব্যয়ের ২০-৪০ শতাংশই ব্যয় হয় জ্বালানি খাতে। ফলে জ্বালানির আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি বড় উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোর ওপর চরম আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ডেল্টা এয়ারলাইনস, এয়ার ইন্ডিয়া ও এয়ার নিউজিল্যান্ডের মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে ফ্লাইট সংখ্যা কমানো এবং যাত্রী ফি বা সারচার্জ বাড়ানোর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ডেল্টা এয়ারলাইনস জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে জ্বালানি খরচ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ শতাংশ বেড়ে ২৭০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে কোম্পানিটি মধ্য-সপ্তাহের এবং রাতের (রেড-আই) ফ্লাইটগুলো ৩ দশমিক ৫ শতাংশ কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে।
এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হওয়ায় তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় কোরিয়ান এয়ার এরই মধ্যে কার্যক্রমে ‘জরুরি ব্যবস্থাপনা’ মোড চালু করেছে। অন্যদিকে চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইনস অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের ওপর জ্বালানি সারচার্জ বাড়িয়ে দিয়েছে।
যাত্রীদের ভোগান্তি ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা নিয়ে আইএটিএ প্রধান উইলি ওয়ালশ বলেন, ‘জ্বালানির দাম এভাবে বাড়তে থাকলে উড়োজাহাজ ভাড়া বাড়ানো ছাড়া এয়ারলাইনসগুলোর সামনে আর কোনো বিকল্প পথ খোলা থাকে না। এটি এখন কার্যত অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও যুদ্ধের উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের এয়ারলাইনসগুলোর বদলে কিছু ট্রাফিক অন্যান্য রুটে ডাইভার্ট হয়েছে।’ তবে ওয়ালশ মনে করেন এটি সাময়িক একটি ব্যবস্থা মাত্র।
বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি চললেও সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ভ্রমণকারীদের পকেট থেকে বেশি টাকা গুনতে হবে এবং ফ্লাইট বাতিলের বিড়ম্বনায় পড়তে হবে।
নিউজিল্যান্ডের জাতীয় উড়োজাহাজ সংস্থা এয়ার নিউজিল্যান্ড এরই মধ্যে অকল্যান্ড, ওয়েলিংটন ও ক্রাইস্টচার্চ রুটে বেশকিছু ফ্লাইট বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছে।
যুদ্ধবিরতির ঘোষণা বৈশ্বিক বাজারে কিছুটা স্বস্তি দিলেও এভিয়েশন খাতের মূল সংকট এখনই কাটছে না। সব মিলিয়ে আগামী কয়েক মাস বিশ্বজুড়ে আকাশপথের যাত্রীদের জন্য এক ব্যয়বহুল ও অনিশ্চয়তাপূর্ণ সময় হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে আইএটিএ।